আমরা একটা সুষ্ঠু, অংশীদারিত্বমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের দিকে অগ্রসর হচ্ছি বলে মনে হয় না

আশিক রহমান : আমরা সবাই চাইÑ দেশে অবাধ, সুষ্ঠু, অংশীদারিত্বমূলক ও গ্রহণযোগ্য স্বাভাবিক একটা নির্বাচন হোক। নির্বাচনের তিন-চার মাস আগে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রচার-প্রচারণা স্বাভাবিকভাবে হবে, কারও মধ্যে কোনো ভয়ভীতি থাকবে না, ভাঙচুর, মারামারি হবে না, পুলিশ অহেতুক কারও বিরুদ্ধে মামলা দিবে না এমন একটি পরিবেশই মানুষ প্রত্যাশা করছে। তবে সুষ্ঠু নির্বাচন বলতে আমরা যা বুঝি সে ধরনের নির্বাচন হওয়ার ব্যাপারে এ মুহূর্তে আমি মোটেও আশাবাদী নইÑ আমাদের অর্থনীতিকে দেওয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে এমন মন্তব্য করেন সংবিধান বিশেষজ্ঞ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. শাহদীন মালিক।

তিনি বলেন, আমার এই নিরাশাবাদের ঐতিহাসিক কারণও রয়েছে। কারণ স্বাধীনতার পর আওয়ামী লীগ সরকারের থাকাকালীন দুটি নির্বাচন হয়েছিল ’৭৩ ও ১৪-এর ৫ জানুয়ারি, নির্বাচন দুটিই ভালো হয়নি। বিএনপি ক্ষমতা থাকাকালীন সময়েও দুটি নির্বাচন হয়েছিল। ’৭৯ ও ৯৬-এর ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন দুটিও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। জাতীয় পার্টি ক্ষমতা থাকাকালীনও দুটি নির্বাচন হয়েছিল ’৮৬ ও ৮৮-তে। এ দুটি নির্বাচনও ভালো হয়নি। স্বাধীনতার পর এ পর্যন্ত ১০টি নির্বাচন হয়েছে তার মধ্যে ৬টি নির্বাচনই সুষ্ঠু হয়নি। বাদ বাকি চারটি নির্বাচনের সময় দলীয় সরকার ক্ষমতায় ছিল না। ’৯১, ৯৬, ২০০১ এবং ২০০৮Ñ এই চারটি নির্বাচন মোটামুটি ভালো হয়েছে বলে আমরা ধরে নিই। এ পর্যন্ত যখনই দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন হয়েছে সেগুলো খারাপ হয়েছে। আগামী নির্বাচন দলীয় সরকারের অধীনে হবে বলেই আমরা ধরে নিচ্ছি। দলীয় সরকারের অধীনে ভালো নির্বাচন করার জন্য যে পদক্ষেপগুলো সরকার নিতে পারত তার কোনো কিছুই তো চোখে পড়ছে না। ভষ্যিতে কী হয় জানি না। তবে এই মুহূর্তে আমরা একটা অবাধ, সুষ্ঠু, অংশীদারিত্বমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের দিকে অগ্রসর হচ্ছি বলে মনে হয় না।
তিনি আরও বলেন, ৩০ বছর আগে আমাদের আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর যে ক্ষমতা ছিল তা এখন অনেকগুন বৃদ্ধি পেয়েছে। আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর সংখ্যা, আধুনিক সাজসরঞ্জাম অনেক বেড়েছে। আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীকে যখন সহিংসতায় ব্যবহার করা হয় তখন স্বাভাবিক রাজনীতিটা থাকে না। সংকট না বললেও আগামী নির্বাচনের পথে আমরা যেভাবে এগোচ্ছি, সমঝোতা, আলাপ-আলোচনার কোনো ইংগিত পাওয়া যাচ্ছে না। প্রতিটি বিষয়েই প্রধান দুই রাজনৈতিক দলের একদল যা বলছে, অন্যদল তার উল্টো অবস্থান নিচ্ছে বা বলছে। অর্থাৎ এখানে কোনো রাজনৈতিক সমঝোতা, আলোচনা, মতামতের ঐক্য বিন্দুমাত্র দেখতে পাচ্ছি না। আমরা প্রত্যাশা করছি, এই জায়গাটায় আগামী চার-ছয়মাসের মধ্যে ব্যাপক পরিবর্তন হবে। ব্যাপক পরির্তনের আশাটাও অল্প, তবে আশাটাও নিঃসন্দেহে করতে হবে যে, এ ধরনের অবস্থানের ব্যাপক পরিবর্তন হবে।

এক প্রশ্নের জবাবে ড. শাহদীন মালিক বলেন, বেগম খালেদা জিয়ার গাড়িবহরের হামলাটি ছিল অপ্রত্যাশিত এবং একই সঙ্গে প্রত্যাশিতও! অপ্রত্যাশিত এই অর্থে যে, দেশের একটা প্রধান রাজনৈতিক দলের নেতা বা নেত্রী রোহিঙ্গাদের দুর্দশা দেখতে যাবেন, সেখানে এরকম হামলা অপ্রত্যাশিত। একটি সভ্য দেশে এমনটি হওয়ার কথা নয়। আর প্রত্যাশিত এই অর্থে যে, বর্তমানে আমাদের দেশের যে রাজনৈতিক সংস্কৃতি তা সভ্য দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির আওতায় পড়ে না। এখন যে রাজনীতি চলছে তা অসুস্থ রাজনীতি। অসুস্থ রাজনীতিই সহিংসতার দিকে নিয়ে যায়। হয়তো ওই অর্থে আমরা এখন অসুস্থ রাজনীতির মধ্যে আছি। এ জায়গাটা যদি আগামী চার-মাসের মধ্যে বিরাট কোনো পরিবর্তন না আসে তাহলে তো আশঙ্কা হচ্ছে পরিস্থিতি সংকট ও সহিংসতার দিকেই যাবে।
তিনি বলেন, আগে রাজনীতি বলতে আমরা বুঝতাম আদর্শের রাজনীতি, যুক্তিতর্ক ও মতামত প্রকাশের রাজনীতি। সেটা এখন নেই। রাজনীতিতে সহিংসতা এত বিপুলভাবে রাজনীতির অংশ হয়ে গেছে, এই অর্থে গাড়িবহরে হামলা প্রত্যাশিতও ছিল।

You may use these HTML tags and attributes: <a href="" title=""> <abbr title=""> <acronym title=""> <b> <blockquote cite=""> <cite> <code> <del datetime=""> <em> <i> <q cite=""> <s> <strike> <strong>